ঈদ, বাড়ি ফেরা না ফেরা কিংবা বিছনাকান্দির গল্প

অনির্বাণ সেনগুপ্ত
দূরে দৃষ্টি সীমায় ধরা দেয় আবছা পাহাড়, । তার গা বেয়ে নামছে জলের ধারা। অনেক উঁচুতে আকাশের কাছাকাছি পাহাড়ের গা ছুয়ে সাদা ধোয়ার দল ঘুরাঘুরি করছে। যেন কুন্ডুলী পাঁকানো ধোয়া বেরিয়ে আসছে পাহাড়ের গভীর থেকে। নাহ্, ধোয়া নয়-মেঘ। বুঝতে খুব একটা দেরি হয় না। কিন্তু ততক্ষণে অদ্ভুদ এক ভালোলাগায় ভরে উঠেছে হৃদয়। এমন স্বর্গীয় দৃশ্য কি আর সচরাচর মেলে? মাঝে মাঝে, মানে বর্ষার মৌসুমে কদাচিৎ এমন নয়নাভিরাম রূপে দেখা দেয় বিছনাকান্দি।

এবারই প্রথম নয়। অনেকবার গিয়েছি বিছনাকান্দি। কিন্তু এমন রূপ এই যাত্রায় প্রথমবার অবলোকন করলাম। ঈদে ছুটি মাত্র তিনদিনের। সংক্ষিপ্ত সময়টা পরিবারের জন্য বরাদ্দ করে রেখেছিলাম অনেক আগে থেকেই। শেষদিনের অফিস শেষে বের হওয়ার মুখে দেখা হয়ে যায় প্রথম আলোর আলোকচিত্রি আনিস মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে। বাড়ি যাচ্ছি শুনে তিনি বললেন, ‘বাড়ি গিয়ে কি হবে। সিলেট থাকো। ঘুরে দেখো, ভালো কিছু পেয়েও যেতে পার।’ সঙ্গে যোগ করলেন, ‘সিলেট থাকলে তোমাকে নিয়ে ঘুরবো।’ দোটানায় পড়ে গেলাম। দেখা হয় দৈনিক কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ফজল ভাইয়ের সঙ্গে। বিষয়টা শেয়ার করি। তিনি আরো উসকে দেন। শেষটায় ‘..পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন’ – এর আশায় সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই, বাড়িতে জানিয়ে দেই- ঈদের ছুটিতে আসছি না।

ঈদের দিন প্রথম ভাগটা ঘুমিয়েই কাটে। বিকেলে অল্প ঘুরাঘুরি। আনিস ভাইর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম কোথায় ঘুরতে যাচ্ছি আমরা আগামীকাল। বললেন ‘তোমরা চলে যাও আমার ঠিক নেই, তবে সকাল বেলা ফোন দিও।’ শুনে প্রচন্ড রাগ হয়েছিল, তবে বিশ্বাস ছিল এই মানুষ কথার বরখেলাপ করবে না।

পরদিন সকাল সাড়ে ৮টায় আনিস ভাই’র ফোন। জিন্দাবাজার পয়েন্টে আসো, আমি আসছি। বেরিয়ে পড়লাম। পয়েন্টের পাশে ভোজন বাড়ি রেস্টুুরেন্টে খিচুরি দিয়ে ভুরি ভোজ সারলাম। ততক্ষণে চলে এলেন সহকর্মী সিলেট মিরর -এর আলোকচিত্রি এইচ এম শহীদুল ইসলাম ভাই। ধীরে ধীরে যুক্ত হলেন ডেইলি স্টার -এর আলোকচিত্রি শেখ নাসির ভাই, দৈনিক সিলেট বাণী -এর আলোকচিত্রি মামুন হোসাইন, দৈনিক শুভ প্রতিদিন -এর আলোকচিত্রি মিটু দাশ। কোথায় যাচ্ছি তা তখনও ঠিক হয়নি!

ঈদে সবার ছুটি থাকলেও যারা মনেপ্রাণে সাংবাদিকতা করেন তাদের ছুটি নেই! থাকলেও ছবি কারিগররা ঠিকই ছবির খুঁজে থাকেন। ভালো ছবি তুলেন উপস্থিতদের প্রায় সবাই-ই। তাই আমাদের কাছে প্রথম পছন্দ বিছনাকান্দি। এখানে অনেক পর্যটক আসবে, ভালো ছবিও পাওয়া যাবে।

ঘড়িতে সময় তখন সকাল ১১টা। মোটর সাইকেলে যাত্রা শুরু হলো আমরা। পথে যুক্ত হলেন সমকাল -এর আলোকচিত্রি ইউসুফ আলী ভাই। চার মোটরসাইকেলে আমরা সাতজন। সবার ‘কাঁধেতে ঝুলানো ব্যাগ’, সবার সঙ্গেই ক্যামেরা। সাতজনের ১৪ চোখ খুঁজেই চলছে। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। ছবি তুলে তুলে দুপুর দেড়টার দিকে আমরা পৌছে যাই হাদারপাড় ঘাটে। মামুন ভাইয়ের ‘পঁচা’ মোটরসাইকেল। পুরোটা রাস্তা জুড়েই ভুগিয়েছে। বারবার চেইন পড়ছে আর তুলছি। সময়ও নষ্ট হয়েছে বিস্তর।

হাদারপাড় বাজার ঘাট থেকে নৌকায় যাত্রা শুরু করলাম আমরা। চারিদিকে পানি, দুর্বার স্রোতের তরঙ্গ দেখবার মতো। অপূর্ব নৃত্যবিবংঙ্গে এঁকেবেঁকে তার পথচলা। চারপাশে নিরবর মাঝে নৌকার ইঞ্জিনের একঘেয়ে শব্দ। দূরে দেখা মিলছে গাছপালায় ঠাসা উঁচু উঁচু পাহাড়। নুড়ি পাথরের ধাক্কা খেয়ে ঢেউ ওঠে নদীর বুকে। চলছে সবার ছবি তোলা। অবশেষে ২টায় গন্তব্যে পোঁছাই।

যেন বরণের ডালি সাজিয়ে বসে আছে মেঘ। পৌঁছা মাত্রই আমাদের ভিজিয়ে বরণ করলো। নৌকায় বসে বসে দেখলাম পাহাড় থেকে কিভাবে মেঘ আকাশে গিয়ে ঝরে পড়ে। চমৎকার এসব দৃশ্য মাতাল করে তুলবে যে কাউকে নিশ্চিত। আনিস ভাই, শহিদুল ভাই, ইউসুফ ভাই বৃষ্টিতে ভিজে ছবি তুলছেন। আমি, নাসির ভাই, মামুন ভাই নৌকায়! ফের আমরা ভিজছি তো আনিস ভাইরা নৌকায়। যদিও আমাদের খুব বেশিক্ষণ পানিতে থাকতে দিলেন না বেরসিক নিরাপত্তাকর্মীরা। দোষ কি আর দেয়া যায় তাদের, বৃষ্টির জলে টুইটম্বুর হয়ে ওঠে নদী। হাঁটু পানিতে নেমেছিলাম আর নিরাপত্তা কর্মীরা যখন তুলে দিচ্ছিলেন তখন তা কোমর পর্যন্ত উঠে এসেছে। অদ্ভুত মাদকতা মাখা পানির সুর ততক্ষণে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। মায়ায় পড়ে যাই। ফিরে আসার যেন কোন তাড়া নেই। তবু তো ফিরতে হবে! সন্ধ্যা নামলো বলে। আমরা ফেরার পথে, আমরা নগরের পথে। পেছনে পড়ে থাকে প্রকৃতির অমোঘ মায়া, পড়ে থাকে সুরের নহর।

বিছনাকান্দি ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
বিছনাকান্দি যে কোন সময় ভ্রমণের জন্যে উপযুক্ত। তবে বর্ষাকাল বিছনাকান্দি ভ্রমণের করলে প্রকৃতির আসল রুপ আমাকে দেখা দিবে। চারদিকে প্রচুর পানি প্রবাহ থাকার কারণে এ সময় বিছনাকান্দির প্রকৃত সৌন্দর্য্যর দেখা মিলে থাকে। বছরে অন্য সময় এখানে পাথর উত্তোলনের কারণে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সাময়িক অসুবিধার সৃষ্টি হয়।

কিভাবে যাবেন সিলেট থেকে বিছনাকান্দি
সিলেটের আম্বরখানার সিএনজি স্টেশন থেকে জনপ্রতি ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় লোকাল সিএনজিতে চড়ে হাদারপার নামক জায়গায় যেতে হবে। সিএনজি রিজার্ভ নিলে সাধারণত ভাড়া ১০০০-১২০০ টাকার মত লাগবে। হাদারপার এসে নৌকা ঘাট থেকে নৌকা ঠিক করে বিছনাকান্দি যেতে হবে। বিছনাকান্দি। নৌকা ভাড়া নিবে ১২৫০ টাকা।শীতকালে ও বর্ষার আগে নদীতে পানি কম থাকে সেই ক্ষেত্রে আপনি চাইলে হাদারপাড় থেকে হেটেও বিছনাকান্দি যেতে পারবেন। শুকনো সময়ে মটরবাইক চলাচল করে থাকে।

কোথায় থাকবেন
বিছনাকান্দি যাওয়া আসার সময় কম লাগার কারণে থাকার জন্য সিলেট শহরকে বেছে নিতে পারেন। হোটেল গোল্ডেন সিটি, হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেইট, ইত্যাদি হোটেলে আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ অনুযায়ী থাকতে পারবেন।

কি খাবেন
বিছনাকান্দিতে খাওয়া দাওয়ার তেমন ব্যবস্থা নেই। আগে থেকেই খাবার সাথে করে নিয়ে যেতে পারেন। এছাড়া সাথে কিছু শুকনো খাবার, পানি ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিতে পারেন। হাদারপার বাজারে সাতকরা নামক রেস্টুরেন্টেও খেতে পারেন। এছাড়া সিলেট শহরে বিভিন্ন মানের রেস্টুরেন্ট আছে, আপনার চাহিদামত সবকিছুই পাবেন। সিলেট এর জিন্দাবাজার এলাকার পানসী, পাঁচ ভাই কিংবা পালকি রেস্টুরেন্টের সুলভ মূল্যে পছন্দমত দেশী খাবার খেতে পারেন, এছাড়াও এই রেস্টুরেন্ট গুলোতে অনেক রকম ভর্তা ভাজি পাওয়া যায় বলে সবার কাছে খুব জনপ্রিয় ।

বিছনাকান্দি ভ্রমন টিপস ও সতর্কতা

  • খরচ কমাতে দলগত ভাবে ভ্রমন করুন ।
  • চাইলে একদিনেই রাতারগুল দেখে বিছনাকান্দি ভ্রমন করতে পারেবেন।
  • সিএনজি ভাড়া করতে ভালো মত দামাদামি কারুন।
  • বিছনাকান্দিতে পানিতে নামার সময় সতর্ক থাকুন।
  • বর্ষাকালে অল্প পানির ¯্রােতের গতিও অনেক বেশি থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
  • সন্ধ্যার আগেই সিলেট শহরে ফিরে আসুন।