কলিকথার ডায়রি : ‘খুব ইচ্ছে, দেশটা দেখব, দেশটা এখন কেমন হয়েছে’

ওয়ালীউল মুক্ত

: এই যে দাঁড়াবেন দাদা?
– জি বলুন…
: বাংলা ছবি দেখেন?

মাঝবয়সী ভদ্রলোক কিছুক্ষণের জন্য চিন্তায় পড়ে যান। তারপর মাথা ঝুঁকিয়ে উল্টো দিকে নিরুদ্দেশ!

বয়সের ব্যবধান ঘুচাতে এবার পথ আগলানো হলো ২০-২২ বছরের এক যুবককে। ফের একই প্রশ্ন। বেচারা খানিক বিব্রত।
সামলে উঠে বললেন, ও ‘বই’-এর (কলকাতায় অনেকে ‘সিনেমা’কে ‘বই’ বলেন) কথা বলছেন? সময় কই বলুন। তারপরও দেখি। বন্ধুদের নিয়ে দেখা হয়। তবে তার বেশিরভাগই হিন্দি ছবি। বাংলা ছবি খুব একটা দেখা হয় না।
এরপর আর তাকে পরের প্রশ্ন করা হয় না। কারণ পরের প্রশ্নটি ‘বাংলাদেশের ছবি’ নিয়ে।

কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের আশেপাশে আরও একজনের সামনস্থ হওয়া। এবার আর কলকাতার বাংলা ছবি নিয়ে প্রশ্ন নয়। সরাসরিই জানতে চাওয়া হলো- বাংলাদেশের ছবির নাম শুনেছেন কিনা?

তার উত্তরও খুব একটা আশা জাগায় না। বললেন, ‌’বাংলাদেশের ছবি (যৌথ প্রযোজনার) এ দেশে এসেছে শুনেছি। কিন্তু দেখা হয়নি।’

: কারও (অভিনয়শিল্পী) নাম বা ছবির নাম মনে আছে?
এবার মানুষটি হেসে ফেললেন। বললেন, ‘না, দাদা মনে নেই।’

শহর কলকাতার আশেপাশে দুইদিন ধরে চললো এ রকম প্রশ্ন-উত্তর পর্ব। মাঝে একজনকে পাওয়া গেল, যে আগে ছবি দেখতেন; বাংলাদেশি ছবি। এখন ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত। নিজের নাম জানালেন না। তবে স্মৃতি হাতড়ে বললেন, বাংলাদেশের একজন অভিনেত্রীর নাম। ৬০ এর কোঠায় বয়স ধারণ করা এ ভদ্রলোক নাম নিলেন অভিনেত্রী ববিতার।

তার কারণও বোঝা যায়- সত্যজিৎ রায়। সাহিত্যে অগাধ জ্ঞান রাখা এ কলকাতাবাসী আর কারও নাম বলতে না পারলেও যখন কয়েকটি নাম তার সামনে আনা হলো, তখন জানালেন- এদের ছবিও দেখতেন। শাবানা, কবরী, রাজ্জাক ছিলেন সে তালিকায়।

কিছুক্ষণ পর মনঃপূত একজনকে পাওয়া গেল। মনে হয় তাকেই খুঁজছিলাম। বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে তার আগ্রহের সীমা নেই। কথা বলারও জন্য কিছুটা অস্থির হয়ে উঠলেন।

সৌম্য চেহারার এ ভদ্রলোকের নাম কানাই চ্যাটার্জি। কলকাতায় থাকেন। একসময় তার বাবা-মা বাংলাদেশে ছিলেন। বরিশাল। দেশভাগের সময় সবকিছু নিয়ে ওপারে উঠেছেন।
বাংলাদেশের ছবির প্রসঙ্গ আনতেই বললেন, ‘না, দেখা হয় না। আগে দেখতাম। তোমাদের বিটিভি তো খুব চলত এখানে। তখন।’

: কারও নাম মনে পড়ে? রাজ্জাক, ববিতা, কবরী, শাবানা?
তার চেহারা প্রশস্ত হয়। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ দেখতাম। তবে একজনের কথা বেশ মনে আছে। হুমাম ফরীদি (হুমায়ুন)। ঐ যে দা হাতে ধাওয়া খেত।’ তিনি ‘সংশপ্তক’ নাটকের হুমায়ুন ফরীদির কথা বললেন। জানালাম, দেশের এ কিংবদন্তি অভিনেতা গত হয়েছেন বেশ আগে।

শুধু চলচ্চিত্র নয়, তার কাছে পাওয়া গেল পুরো বাংলাদেশের চিত্র। আমার কাছে চেয়ে নিলেন বাংলাদেশের কিছু পয়সা। স্মৃতি হিসেবে রেখে দেবেন।

কলকাতায় রেলওয়ে দফতর কয়লাঘাট ভবনে কাজ করা এ মানুষটি হঠাৎ আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা তোমরা এখনও কচুর লতি খাও? শাপলা ডগার তরকারি?’

পুরনোকে খুঁজে আরও বললেন, ‘অনেকদিন খাওয়া হয় না, বুঝেছ! মা মারা যাওয়ার আগে রাঁধতেন। ওপারের মেয়ে তো।’

অবাক হয়ে আড়চোখে তাকে দেখি। তার দৃষ্টি বিবর্ণ, বিষণ্ণ।

কিছুক্ষণ থেমে সৌম্য এ মানুষটা চঞ্চল হন। হুট করেই বলেন, ‘খুব ইচ্ছে, দেশটা দেখব, দেশটা এখন কেমন হয়েছে…। হয়তো তা আর হবে না।’