সিলেট ছাত্রলীগে দ্বন্দ্বের বলি ১০

নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেট নগরের টিলাগড় মানেই যেন লাশের মিছিলের মঞ্চ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সিলেট নগরে ৯ বার প্রাণ নাশের ঘটনা ঘটেছে, যার বেশিরভাগই হয়েছে টিলাগড়ে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার ও সিনিয়র জুনিয়র দ্ব›েদ্বর কারণেই এই প্রাণ নাশের ঘটনা ঘটছে। গত বৃহস্পতিবার রাতেও টিলাগড়ে খুন হয়েছেন একজন। ছাত্রলীগ কর্মী অভিষেক দে দ্বীপের নামের একজন সামিল হয়েছেন টিলাগড়ের মৃত্যুর মিছিলে।

শুক্রবার ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। পরে তার সৎকার সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই ঘটনায় এখন অবধি কোনো মামলা হয়নি। জড়িতদের মধ্যেও আর কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গত বৃহস্পতিবার রাতে নগরের টিলাগড়ে স্বরস্বতি পূজার চাঁদার ঝামেলা একই গ্রæপের কর্মীদের হাতে নিহত হন অভিষেক দে দ্বীপ। তিনি নগরের শিবগঞ্জের সাদিপুর এলাকার বাসিন্দা দীপক দে’র ছেলে। সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ কর্মী দ্বীপ ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকারের অনুসারী। গোপালটিলা এলাকার সল্টু রায়ের ছেলে সৈকত রায়ের নেতৃত্বে কয়েকজন রাত সাড়ে ৯টার দিকে হামলা চালায়। সৈকত রায়ও একই কলেজের ছাত্রলীগ কর্মী।

সৈকত বর্তমানে আটক রয়েছে পুলিশের কাছে। হামলার সময় কয়েকজনের সঙ্গে সৌরভ নামে একজন ছিলেন বলেও অভিযোগ ওঠে। দ্বীপকে ছুরিকাঘাতের সময় তার সঙ্গে তার বন্ধু শুভ ছিলেন। তিনিও আহত হন। হামলাকারী সৈকত রায়ও ঘটনার সময় আহত হন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট মহানগর পুলিশের শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাইয়ূম চৌধুরী সিলেট মিররকে বলেন, নিহত দ্বীপের ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সৎকার শেষ হয়েছে আজ (গতকাল)। আগামীকাল (আজ) দ্বীপের পরিবার মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, এই খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের মধ্য থেকে একজনকে আটক রয়েছে। নিহতের পরিবার মামলার পর কোন পথে তদন্ত যাবে তা আমরা বুঝতে পারবো। মামলা বা অভিযোগ দায়ের না হলে আর কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করতে পারছি না।
এক বছর পেরিয়ে গিয়েছিল শান্তিতে। সিলেটের রাজনীতিতে ছিল না কোনো প্রাণ নাশের ঘটনা। তবে পুরনো বছরের বিদায়ের সঙ্গে নতুন বছর আসতে না আসতেই যেন জানান দিল সিলেটের মৃত্যুর মিছিল। আর সিলেটে মৃত্যুর মিছিল মানেই টিলাগড়।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পর ২০১০ সালে টিলাগড়ে ছাত্রলীগের কোন্দলে খুন হন এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর টিলাগড় এলাকায় প্রতিপক্ষ গ্রæপের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ছাত্রলীগের কর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম। মাসুম হত্যার এক মাস পূর্ণ হতে না হতে ১৬ অক্টোবর খুন হন নিপু অনুসারী ছাত্রলীগকর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ। গত ৭ জানুয়ারি রাতে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন ছাত্রলীগকর্মী তানিম খান।

এর আগে ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফরের আগের দিন নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় নিহত হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএ চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগকর্মী কাজী হাবিবুর রহমান হাবিব। ২০১৫ সালের ১৫ জুলাই মদিনা মার্কেটে একটি অটোরিকশা স্ট্যান্ড দখল নিয়ে নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় খুন হন ছাত্রলীগকর্মী আব্দুল্লাহ ওরফে কচি। একই বছর ১২ আগস্ট মদন মোহন কলেজে খুন হন ছাত্রলীগকর্মী আবদুল আলী। ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ছাত্রলীগকর্মী সুমন চন্দ্র দাশ।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে খুন হন হুসাইন আল জাহিদ নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী। নগরের উপশহরে তাকে ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়। ওসমানী হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। সে সিলেট নগরের সীমান্তিক স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
এই হত্যাকান্ডগুলোর প্রত্যেকটি বিচারাধীন রয়েছে। কয়েকটি আদালতে বিচারাধীন, কোনোটি আবার সিআইডির তদন্তাধীন রয়েছে বলেও জানা গেছে।

একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। সেটা যেন থামানোই যাচ্ছে না। এর মধ্যে টিলাগড় নাম নিয়েছে ‘কিলিং জোন’ হিসেবে।

নেতৃত্ব পরিবর্তনের দীর্ঘসূত্রিতা হ্রাস এর থেকে উত্তরণের উপায় বলে মনে করেন সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রাহাত  তরফদার।

তিনি বলেন, নেতৃত্বে পরিবর্তন না এলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা যায় না। আবার দীর্ঘদিন নেতৃত্ব শূন্য থাকলেও মনিটরিং করার কেউ থাকে না। সিলেটের জেলা ও মহানগর ইউনিটের কমিটি নেই দীর্ঘদিন ধরে। ফলে এগুলো দমন করারও কেউ নেই। কমিটি থাকলে কয়েকদিন পরপর এরকম অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতো না।